ঢাকা , শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬ , ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ল ইজ নট ব্লাইন্ড: বিচারাঙ্গন পাপ মুক্ত হবে কবে?

আপলোড সময় : ৩০-০৫-২০২৬ ০১:৫৯:০৪ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় : ৩০-০৫-২০২৬ ১২:৩৯:০৩ অপরাহ্ন
ল ইজ নট ব্লাইন্ড: বিচারাঙ্গন পাপ মুক্ত হবে কবে? মো.ওবায়েদ উল্যাহ ভূলন
মো.ওবায়েদ উল্যাহ ভূলন:  আদালতে বার্তা- ‘ল ইজ নট ব্লাইন্ড’। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সামনে লেডি জাস্টিজের চোখ বন্ধ কালো কাপড়ে। অর্থ- আদালতের সামনে, আইনের সামনে সবাই সমান। এটাই চোখ বাঁধা লেডি অব জাস্টিসের আইনের সংজ্ঞা। কিন্তু আক্ষরিক অর্থে কারো কারো কাছে, কখনো, কোথাও এই ‘ল ইজ ব্লাইন্ড’ হয়ে ওঠে সত্যি সত্যিই ব্লাইন্ড। এক পক্ষের কাছে ‘ব্লাইন্ড’, আবার অন্য পক্ষের জন্য ‘নট ব্লাইন্ড’। তাই অনেক বড় প্রশ্নের সম্মুখীন এ যুগের বিচারাঙ্গন। 
 বিগত আ.লীগ সৌরশাসনামলে সরকারবিরোধীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা দিয়েছে। তখন পুলিশ ও সরকার বলেছে- ‘আইন অনুযায়ীই মামলা হয়েছে’। শত শত আসামি তখন আদালতের বারান্দায় সুবিচারের আশায় ঘোরাঘুরি করেছেন। মামলায় জামিন পাননি তখন অনেকেই। বিচার হয়েছে, শাস্তি হয়েছে। সরকার বলেছে- ‘আইন মেনেই আদালত তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে’। আজ দৃশ্য পাল্টে গিয়েছে। পরিবর্তিত বাংলাদেশের আদালত পাড়ায় ভিন্ন চিত্র। আজ আগস্ট অভ্যুত্থানের বিরোধীরা, পতিত সৌরসরকারের রাজনৈতিক নেতা-কর্মী-সমর্থকরা মামলার আসামি হচ্ছেন। মামলা হচ্ছে। গ্রেপ্তার হচ্ছেন। আদালত এবং বিচারকগণ রিমান্ড আদেশ দিচ্ছেন। চিত্রটি প্রায় একই। আদালত পাড়া ওটাই, আইন ওটাই- শুধু আসামির পরিবর্তন এবং বিচারাঙ্গনের বিচারকগণের বেঞ্চ  পরিবর্তন হয়েছে তাহলে চরিত্র পরিবর্তন হবে কিভাবে?  তখনো সরকারের ভাষ্যে- আইন তার নিজস্ব গতিতে হেঁটেছে, আজও সরকারের ভাষ্যে- আইন তার নিজস্ব গতিতেই হাঁটছে। ধরে নিতেই পারি, তখনো আইন-আদালত ন্যায়বিচার দিয়েছে- আর এখনো আইন-আদালত ন্যায়বিচার দিচ্ছে। তা-ই যদি হবে, তবে এই উদাহরণগুলোর ব্যাখ্যা করবেন কীভাবে?
১/১১ সরকারের সময়ের বিএনপির নেতাদের ভূমিকার কথা নাই বললাম, কারণ ১/১১ ফখরুদ্দিন মইনুদ্দিন সরকারের সাথে আতাতকরে বিএনপির ‌১২'টা বাজানোর জন্য যারা সংস্কারপন্থির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন তারা তো আজ অনেকেই ডাবল পুরস্কার প্রাপ্ত। 
সমস্যা কি? ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া।  মিথ্যা মামলায় জেল খেটে অবশেষে পরপারে পারি জমিয়েছেন এবং মাজার হাড় ভেঙ্গেছে তারেক রহমানের,দেশান্তরিত হয়েছিলেন তারেক রহমান। আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা। ধারাবাহিকভাবে এখন বিএনপি থেকে ডাবল পুরস্কার প্রাপ্তদের কর্তৃক ১৭ বছর যারা ত্যাগ স্বীকার করে রাজনৈতিক ময়দানে থেকে মামলা হামলার শিকার হয়েছেন তারাই এখন নতুন আঙ্গীকে হয়রানির শিকার হচ্ছে। প্রতিবাদ করলেই  চাঁদাবাজির ট্যাগ লাগানো হচ্ছে। পছন্দের সেই পুলিশ কর্মকর্তাদেরকে তো যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া আছে তাই করছে পুলিশ।(আশ্চর্যের ব্যাপার হল বিগত ১৭ বছরে ঐ সকল কর্মকর্তাদের অনেকেই সাব ইন্সপেক্টর থেকে সহকারী পুলিশ সুপার পর্যন্ত পদোন্নতিপ্রাপ্ত) আজ তারা কেউ সার্কেল এসপি এর দায়িত্বপ্রাপ্ত। কোন পুলিশ কর্মকর্তা যদি ঊর্ধ্বতনদের অন্যায় আদেশ মানতে অনিহা প্রকাশ করে তাহলে তাৎক্ষণিক ট্রান্সফার হতে হচ্ছে এবং বিভাগীয় মামলারও শিকার হচ্ছে।
আমার দেখা আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের ১৭ বছরে বাংলাদেশের বহু অঞ্চলে বিএনপির অনেক নেতাই আজকে যারা বিএনপি সরকারের মন্ত্রী পরিষদের সদস্য হয়েছেন তারা সেদিন ফ্যাসিস্ট সরকারের অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হননি। হবেনই বা কিভাবে তারা তো তখন বাংলাদেশের মাটিতেই ছিলেন না। বিদেশের মাটিতে  দলীয় নেতাকর্মীদের কাছ থেকে ভিক্ষাবৃত্তি করে আরাম-আয়েশে বিলাসবহুল হোটেলে দিন যাপন করেছেন। ক্ষমতায় আসলে মন্ত্রী হবেন,দেশে এসে বিভিন্ন কৌশলে তার চেয়ে হাজারগুন বেশি টাকা ইনকাম করবেন,সে আশায় তারা ইনভেস্টও করেছেন। উনারা সফলও হয়েছেন! 
১৭ বছর এলাকায় না থেকে,দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে না থেকে,দলীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ না করেও ৫ আগস্ট ২০২৪ ইং এরপরে বাংলাদেশে এসেই বিভিন্ন অজুহাতে বিগত ১৭ বছর যারা এলাকায় থেকে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, জেল খেটেছেন জুলুমের শিকার হয়েছেন,আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের সাথে নাম জড়িয়ে বিভিন্ন এলাকায় মামলা করে হয়নি করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলা - বর্তমান বিএনপি সরকারের শিক্ষা মন্ত্রী এহসানুল হক মিলন। ৫ আগস্ট ২০২৪ পরে বাংলাদেশের এসে কচুয়া উপজেলায় বিএনপি,যুবদল ও  ছাত্রদলের ১৭ বছরের নির্যাতিত নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের সাথে বিভিন্ন মামলার আসামি করে শুধু হয়রানি করে ক্ষান্ত হননি। আদালতেও বিচারকদের বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটিয়ে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠাচ্ছেন।
কিন্তু ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর যারা ১৭ বছর বিএনপি'র নেতা কর্মীদেরকে হয়রানি করেছেন, নির্যাতন করেছেন,জেল খাটিয়েছেন  ঐ সকল দোসর দেরকে আসামি না করে বরং তাদের সাথে একাকার হয়েছেন।
মিলন সাহেব বর্তমানে এতটাই বেপরোয়া তার বিরুদ্ধে কোনো নিউজ হলে তার নির্বাচনী এলাকা কচুয়ার কোন ব্যক্তি নিউজ শেয়ার করলেও শেয়ার করার অপরাধে ডিজিটাল আইনে মামলা করানো হচ্ছে।
 আইন ও আদালত তার নিজস্ব ভাষায় কথা বলতে পারলে বারবার আমাদের এমন চিত্র দেখতে হতো না। বৈষম্যের শিকার হয়ে আন্দোলন করে আবার কি সেই বৈষম্যেরই শিকার?
একটা দেশর মাপকাঠি শুধু জিডিপি, ফ্লাইওভার, রেমিট্যান্স নয়। আসল মাপকাঠি হলো- সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের কাছে হয়রানি ছাড়া সেবা ও ন্যায় পায় কি না?
Transparency international এর জরিপে- বাংলাদেশ পুলিশের কাছে সেবা নিতে যাওয়া ৮৪% মানুষ ঘুষ দিয়েছেন। ৭৫% বিচার বিভাগে আর ৭৩% ভূমি অফিসে।
এই তিনটি প্রতিষ্ঠানেই রাষ্ট্রের মেরুদন্ড। মেরুদন্ডে আঘাতপ্রাপ্ত হলে দাঁড়ানো যায় না। 
পুলিশ: সেবার বদলে শোষণ- থানায় জিডি করতে গেলে টাকা, মামলা তুলতে গেলে টাকা এমনকি নির্দোষ প্রমাণ করতে গেলেও টাকা। পুলিশ হেডকোয়ার্টার নিয়ম চালু করেছেন কোন পুলিশ কর্মকর্তা অপরাধ করলে আইজিপি'স কমপ্লেন সেলে তাৎক্ষণিক অভিযোগ করলে তদন্ত সাপেক্ষে বিচার ব্যবস্থার। কিন্তু তাও কাগজে-কলমে। কোন ভুক্তভোগী অভিযোগ করলে বিভিন্ন অজুহাতে ঐ সকল পুলিশ কর্মকর্তাদেরকে বাচিয়ে দিচ্ছে। যার কারণে পুলিশের ঐ সকল কর্মকর্তাদের আরো বেশি রোশনালের শিকার হচ্ছে ভুক্তভোগীরা। যখন রক্ষকই ভক্ষক তখন নাগরিকের শেষ আশ্রয়টুকু থাকে না। 
বিচার বিভাগ: বিনা কারণেই টাকা দিলেই তারিখের পর তারিখ। ঘুষের পর ঘুষ। আর ভূমি সংক্রান্ত মামলা হলে তো কথাই নাই ধরে নিতে হবে ২০ বছরের জন্য হয়রানি কিনে নেওয়া হল। জামিনের জন্য টাকা, নথি তুলতে টাকা, রায়ের জন্য টাকা। ঘোষের মাধ্যমে আদালতে মামলার রায় পর্যন্ত নিজের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব। ম্যাজিস্ট্রেট বা জজ সাহেব কে  ঘুষ দিলেই ঘুষ দেওয়া ব্যক্তিদের ইচ্ছা অনুযায়ী রায় প্রদান করা হয়।যার অসংখ্য উদাহরণ বিভিন্ন আদালত পাড়ায় আছে। সরকারের উচিত -- বিভিন্ন আদালতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা। কারণ বিচারক কিন্তু ওরাই যারা ১৭ বছর সরকারের নির্দেশনা মেনে বিএনপি নেতাকর্মীদেরকে হয়রানি করেছেন। বিচার পেতেই যদি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম লাগে, ঘুষের মাধ্যমে কোন পক্ষ মনগড়া রায় নিতে পারে,তাহলে আইনের শাসন কোথায়? 
ভূমি প্রশাসন: নামজারি, খতিয়ান, দলিল- প্রতিটি ধাপে টেবিলের নিচের হাত। ভূমি সেবা শতভাগ অনলাইন, অটো মেটেড মিউটেশন, আর সাব রেজিস্টার অফিসের দালালমুক্ত পরিবেশ এখনই করা উচিত। 
তাই উন্নয়নের স্লোগানের আগে দরকার শুদ্ধির স্লোগান। পুলিশকে জনবান্ধব, বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা, ভূমিকে দালালমুক্ত না করতে পারলে বাংলাদেশ কাগজে কলমেই স্মার্ট থাকবে। নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সর্বোপরি সরকার- সবারই এজেন্ডা হওয়া উচিত, পুলিশ, বিচার বিভাগ, ভূমি প্রশাসনকে পাপ মুক্ত করা।
 

নিউজটি আপডেট করেছেন : Bangla Release 24

কমেন্ট বক্স

প্রতিবেদকের তথ্য

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ